নিঝুম রাত ( পর্ব ১)


রাত তখন প্রায় ১১ টা ছুঁই ছুঁই। অনিল সবে মাত্র ডিনার সেরে খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এক সিগারেট ধরিয়ে তাতে টান দিতে ব্যস্ত। পুলিশ কোয়ার্টারে থাকতে থাকতে এই যখন তখন ঘরের মধ্যে সিগারেট জ্বালিয়ে খাওয়ার অভ্যাস টা বেশ শক্ত হয়ে ওর মধ্যে বসে গেছে। আর না বসেই বা উপায় কি, বাড়িতে থাকলে হয়তো এধরনের অভ্যাস কখনোই জন্ম নিতো না। সে যাইহোক তবে ডিউটির অক্লান্ত পরিশ্রমের পর রাত্রে বেলায় দুটো খাওয়ার মুখে দিয়ে একটা লম্বা সিগারেটের টান অনেকটাই যেনো চাপ, অস্থিরতা কমিয়ে দেয়। অনিল একজন লোকাল থানার কর্তব্যরত কনস্টেবল। হ্যাঁ অবশ্য বেশ কয়েকবার বদলি হওয়ার-ও রেকর্ড তার মধ্যে রয়েছে। আর তাই এখন তার কর্মস্থল বাড়ি থেকে প্রায় ৪০ কিমি দূরে। পথটা নেহাতই খুব একটা কম নয় রোজ যাতায়াতের ক্ষেত্রে, তাই বাধ্য হয়েই পুলিশ কোয়ার্টারের গন্ডির মধ্যেই দিব্যি মানিয়ে চলেছে। ঝাড়গ্রামে আসার সুবাদে এখানকার বেশ কিছু মানুষের সাথে বেশ আলাপ পরিচিতিও হয়ে উঠৈছে। যদিও পুলিশের লোক বলে কথা, এলাকার নামকরা চোর ডাকাত এদের চেনেন বিলক্ষণ। আর চেনাটাও স্বাভাবিক। যাইহোক এই গেলো অনিলের কথা এবার ঘটনায় আসা যাক। অনিল সিগারেট টা জানালা দিয়ে ফেলতে যাবে এমন সময় তার চোখে পড়লো জানালার সোজাসুজি বড়ো বটগাছের বেদিটা থেকে কিসের যেনো একটা আলো ঝলসে আসছে। কারো টর্চের আলো নয় এটা সে নিশ্চিত। তবে?, অনিল দূর থেকে কিছুই স্পষ্ট করতে পারলো না। বাইরেটা নেহাতই খুব অন্ধকার, রাস্তার স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোটা জ্বললেও সেটা ওই রাস্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ল্যাম্পের একটা দিকের বাতি যেন কেউ পরিকল্পনামাফিক-ই ভেঙে ফেলেছে। তাই বোধহয় আলোটা সম্পূর্ন এলাকাটা প্রদক্ষিণ করতে পারছে না। অনিলের মনেও বেশ একটা কৌতুহল জেগে উঠলো। একেই পুলিশের লোক তার ওপর এমন এক সন্দেহভাজন আলো তাকে বেশ অবাক করে তুলল। অনিল হাতে বড়ো টর্চ টা নিয়ে দরজার দিকে অগ্রসর হতেই ফোনে রিং বেজে উঠলো। নম্বর টা অফিসের টেলিফোনের নয় আর চেনা কারো মনে হলো না। অনিল ফোন ধরতেই ফোনের ওপার থেকে বেশ সতর্ক পূর্ণ এক গলা ভেসে উঠলো। রীতিমত সতর্কের সাথে তাকে ব্যাক্তিটি বলে উঠলো 'আপনি সবকিছুতে অযথা কৌতুহল দেখাবেন না, নাতো বিপদে পড়ে যাবেন'। এই বলে ফোনের লাইনটা কেটে গেলো, হয়তো কেটে দেওয়া হলো। অনিল ঠিক কিছুই ধারনা করতে পারলো না। অনিল বরাবরই সাহসী আর তার ওপর পুলিশের কর্মী। তাই সে এই ব্যাপারটা ঠিক গায়ে মাখলো না।তার মাথায় তখন সেই রহস্যময় আলোর কৌতুহল। অনিল জানালাটার দিকে একবার ফিরে চাইতেই দেখতে পেলো আলোটা তখনের মতো অতো উজ্জ্বল নয়, বেশ অস্পষ্ট। হয়তো জানালা থেকে বেশ কিছুটা দূরে পিছিয়ে আসায় তার এরকম মনে হচ্ছে। সে আর কিছু না ভেবেই টর্চ হাতে নিয়ে দরজা খুলে এগিয়ে চললো বড়ো বটগাছটার দিকে। অনিল যত এগিয়ে চলতে থাকলো আলো তত স্পষ্ট হলো। আলোটা যেন উজ্জ্বল ভাবে তাকেই তার নিকট আহ্বান করে চলেছে। অনিল-ও গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চললো আলোর দিকে। যখন একবারে সামনে পৌছলো তখন এক প্রচন্ড শব্দের সাথে এক আগুনের গোলার মতো কিছু তার কানের পাশ দিয়ে তার ওই জানালায় আঘাত করলো। জানালার খুলে থাকা পাল্লা তার প্রচন্ড আঘাতে সজোরে যেন খুলে যাওয়ার উপক্রম। অনিল বুঝতে পারলো এ আর কিছু নয়, ভেসে আসা এক শক্তিশালী বুলেট যেটা তাকেই লক্ষ্যভ্রষ্ট করে জানালায় আঘাত করলো। অনিল ততক্ষণে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ আর কোনো গোলাগুলি ভেসে এলো না। কোয়ার্টারে অনিল ছাড়াও থাকতো তিনজন বেশ ছোটো কোয়ার্টার তাই। আর আজ তারা কেউই কোয়ার্টারে নেই। দুজন নাইট ডিউটিতে এর একজন ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে। অনিল কিছুটা দেখে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। আশ্চর্যের ব্যাপার তখন আর সেই অদ্ভুত আলোটা তার চোখে পড়লো না। এতো কাছে এসে আলোটাকে সে যেনো কোথায় হারিয়ে ফেললো। অনিলের সবকিছু ধোঁয়াশা মনে হলো। সে আশেপাশে বেশ নজর বোলাতে লাগলো। হঠাৎ সে উপলব্ধি করলো তার চটির তলায় বেশ কিছুটা মাটি লেগে রয়েছে উঁচু হয়ে। সে চটি খুলে মাটিটা ঝারতে যাবে এমন সময় দেখলো শুধু মাটি নয়, জুতোতে অনেকক্ষণ কোনো পাথর জুতোর তলায় চাপা পড়ে থাকলে যেমন চিহ্ন পড়ে একদম হুবহু সেরকম। পাথর? কিন্তু এখানে তো পুরোটাই ভিজে মাটি সেরকম মাপের পাথর ধারেকাছে নেই। যাও আছে তাও ওই নুড়ি কাঁকর। কিন্তু তাতে তো এরকম ছাপ হবে না এরকম জুতোর নিচটা  আঘাত পাওয়ার মতো হয়ে উঠবে না। তবে?, অনিল যেখানে লুকিয়ে ছিলো গাছের আড়ালে, সেখানে ভালো করে নজর বোলাতে লাগলো না তেমন কিছুই চোখে পড়লো না। নিতান্তই হতবাক হয়ে সে রুমের দিকে অগ্রসর হতে থাকলো। রুমে ঢুকে ঘড়িতে চোখ যেতেই দেখে রাত তখন ১২:৩০ ছুঁই ছুঁই। বেশ এক রহস্যময় রাতের সাক্ষী থাকলো সে। কিন্তু ওই আলো সাথে ফোন কল সাথে তার ওপর হওয়া গুলি সবকিছু মিলেমিশে ভাবতে ভাবতে তার নিদ্রা সেই রাতের জন্য নষ্ট হলো। ঘড়িতে তখন ভোর পাঁচটা। দরজার ঠোকুনির শব্দ। অনিল ঝটপটিয়ে উঠে দরজা খুলে দেখে তার দুই সহকর্মী, যারা কাল রাতে কোয়ার্টারে ছিলো না ডিউটিতে ব্যস্ত ছিলো। অনিলের মুখের দিকে তাকিয়ে তারা জানতে চাইলো 'সব ঠিক আছে তো?' অনিল বেশ হতবম্ব হয়ে বললো 'কেনো? কি হবে' তারা বললো ' রাস্তায় আস্তে আস্তে শুনলাম কাল নাকি কোয়ার্টারের এলাকা থেকে গুলির শব্দ পাওয়া গেছে? যারা সকাল সকাল প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়েছে ওনারাই বলাবলি করছিলো'। অনিল বললো 'হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো। আসলে টার্গেট ছিলাম যে আমি'। তার কথা শুনে একজন সহকর্মী জানতে চাইলো' কি বলো? তোমায় কে মারতে চাইবে? '। অনিল বললো' আমরা পুলিশ, আমাদের শত্রুর কি আর অভাব আছে। যাইহোক তোমরা বলো কাল রাতে কিছু ঘটনা পেয়েছো নাকি তাক লাগানো মতো? '। একজন সহকর্মী বলে উঠলো' আর বলো না ভীষন সাংঘাতিক ব্যাপার, ওপারার রমেন দাসের বাড়ি থেকে কাল দুপুরে এক হীরের আংটি চুরি হয়েছে। বেশ ওজন ছিলো আংটিটার। ওদের বাড়ির ঝি চাকরদের জেরা করা হয়েছে কিন্তু তেমন বিশেষ কিছু লাভ হয়নি। বড়োবাবু বলছেন এটা হতে পারে চোরাই কাঠ পাচারকারীদের কাজ। কেননা রমেন দাস স্বীকার করেছে কিছুদিন আগে তার বাড়িতে একটা শাল গাছ কাটা হয় তিনি সেটা ভালোই দামে একজন গাছ ব্যবসায়ীর কাছে। সেইসময় হয়তো গাছ কাটতে আসা লোধারা ওনার হাতে ওই আংটি দেখেছিলেন। আর সেই লোভ সামলাতে না পেরেই রমেন বাবু বাড়িতে না থাকার সুযোগ নিয়ে দরজা ভেঙে সেটা চুরি করেছে। আর তুমিতো জানোই লোধাদের সাথে এখানকার চোরা চালানকারীদের বেশ হাত রয়েছে। এবার আর কি ভালো দামে বিক্রি করে মুনাফা লুঠবে '। অনিল বলে উঠলো' কিন্তু রমেন বাবু আংটি টা তো হাতে পড়ে থাকেন তবে ওরা চুরি করলো কিভাবে? '। শুনে সহকর্মী জবাব দিলো' সেটাই তো আশ্চর্যের বিষয়, রমেন বাবু যদিও বলছেন তখন সেটা খুলে তিনি বাইরে গিয়েছিলেন এক দরকারে আর তখনই এই কান্ড ঘটে। বড়োবাবু বলেছেন আংটি না পাওয়া গেলে এবার রমেন বাবুকে অর্থের পুরষ্কারের লোভ দেখাতে বলবেন,। এই শুনে অনিল বললো 'বেশ রোমাঞ্চময়। হিরের আংটি, গুলি, আলো, জুতোয় ছাপ এই নিয়ে বেশ গেলো কাল শেষ বেলাটা'। এই শুনে ওই পলাশ নামের সহকর্মী বলে উঠলো ' কি বলছো? আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না।' অনিল বললো 'আমারো নয়', এই বলে সে পুরো ঘটনাটি তার দুই সহকর্মীকে খুলে বললো। সব শুনে তারা রীতিমত হতবাক হয়ে উঠলো। পলাশ বললো' চলো এখনি থানায় গিয়ে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলবে তারপর দেখি বড়োবাবু কি নির্দেশ দেন'।

   অনিল তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে কৌটো থেকে দুটো বিস্কুট জল দিয়ে চিবিয়ে ছাতাটা হাতে নিয়ে তার এক সহকর্মী পলাশকে নিয়ে চললো থানার উদ্দেশ্যে। থানায় ঢুকে বড়োবাবুর ঘরের দিকে যেতে গিয়ে নজর আসে বড়ো বাবুর মুখোমুখি চেয়ারে রমেন দাস বসে। রমেন দাসের সাথে আলাপটা বেশ কিছুদিন আগেই অনিলের হয়েছিল। একবার রমেন বাবুর বাড়ি লাগোয়া এক ক্লাবে হাতাহাতির ঘটনায় পুলিশের সাথে অনিল-ও সেখানে উপস্থিত ছিলো। সেখান থেকেই পরিচয় আর কি। সেই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট রমেন বাবু। আসলে ক্লাবের দুটি ছেলের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে বেশ গন্ডগোল বেঁধে যায়। আর সেখান থেকেই হাতাহাতির ঘটনা। যেহেতু রমেন বাবু সেই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট তাই তার জড়িয়ে যাওয়াটাও খুব অপ্রাসঙ্গিক নয়। রমেন বাবুকে দেখতে বেশ লম্বা চওড়া,বেশ স্বচ্ছল। চেহারাতেও এক অবস্থাপূর্ন ইঙ্গিত স্পষ্ট। অনিলকে দেখেই বড়োবাবু বলে উঠলো ' কি হে অনিল! খবরটা শুনেছো নিশ্চয়ই?'। অনিল-ও জবাব দিলো 'হ্যাঁ স্যার সব শুনেছি'। রমেন বাবু-ও এই ফাকে অনিলের গোটা শরীরটা চোখের ইশারায় মেপে ফেললেন। রমেন বাবু বড়োবাবুর উদ্দেশ্যে হঠাৎ বলে উঠলো ' দেখুন কাল থেকে তো আপনারা অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলো না, তাই আমার মতে আপনারা আপনাদের মতো খুঁজুন তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু এইভাবে আর আমার ওটার আশা রাখা বোধহয় ঠিক হবে না কারন বুঝতেই তো পারছেন, আমি ব্যবসায়ী মানুষ। এটার পিছনে ছুটতে গিয়ে ব্যবসার ক্ষতি করে বসলে আমার চলবে না। তাই আমার মনে হয় আমি আর থানা বা আপনাদের জেরার সময় দিতে পারবো না। আপনারা চেষ্টা করে যান, যদি পান তো খুব ভালো কথা। আমায় তখন জানাবেন না হয়, এখন আমি উঠি। আমায় আবার দোকান খুলতে হবে, আসলে কর্মচারীগুলোর ওপর এই ঘটনার পর আর ঠিক ভরসা হচ্ছে না। তাহলে উঠি হ্যাঁ। নমস্কার! '। এই বলে রমেন দাস প্রস্থান করলো। অনিলের বিষয়টা খুব অবাক লাগলো। হীরের আংটি বলে কথা আর এই অল্প সময়ের মধ্যে কি করে একটা মানুষ এর মায়া ত্যাগ করতে পারে। আবার এটাও মনে হলো যার কিনা এতো এতো সম্পত্তি তার কাছে একটা আংটির মূল্য নিতান্তই সাধারণ। কিন্তু ওইযে খটকাটা ওখানেই লাগছে জিনিসটা যে হীরে। যাইহোক অনিল আর এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে বড়োবাবুকে কাল রাতে তার সাথে ঘটা সমস্ত ঘটনার বিবরন দিলো। শুনে বড়োবাবু বেশ হতবম্ব হয়ে গেলো। অনিল-ও সব ঘটনা বলার পর পলাশকে কোয়ার্টারে পাঠিয়ে দিলো আর নিজে থানায় ডিউটিতে মত্ত হলো। কিন্তু কাল রাতের সেই রহস্যময় স্মৃতি তার পিছু ছাড়লো না। সে নির্বিকারে ভেবে চললো। দেখতে দেখতে দুপুর ঘনিয়ে এসেছে। বড়োবাবু থানার অন্য কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে রাউন্ডে বেরিয়েছেন। দুপুরবেলা থানার নিকট এক ছোটো হোটেলেই সে খাওয়াদাওয়া সেরে আবার থানার কাজে মত্ত হলো। এভাবে সারাদিন কেটে এলো। সন্ধ্যা নামে নামে ঠিক তখনই তার কোয়ার্টারের দুই সহকর্মী থানায় প্রবেশ করলো। অনিলের হাতে কোয়ার্টারের চাবি দিয়ে যে যার টেবিলে চলে গেলো। কারন এখন অনিলের ছুটি হয়ে এসেছে তাকে আবার কোয়ার্টারে ফিরতে হবে। আবার সেই একাকী রাত তাকে কি উপহার দেয় এটা অনিলের-ও বোধগম্য নয়। সে বড়োবাবুর রুমে দেখা করে থানা থেকে বেরিয়ে পুলিশ কোয়ার্টার থেকে দেওয়া সাইকেলটা নিয়ে গন্তব্যের পথে যাত্রা করলো। সন্ধ্যা তখন ৭:৩০। হাতে সেই ছাতা, আজ সকালে তাড়াহুড়োতে টর্চটা আনতেও ভুলে গেছিলো। অন্ধকার পথ স্ট্রিট লাইট জ্বললেও তার আলো বেশ ছাড়া ছাড়া। হয়তো রাস্তার ধারের জঙ্গলের পুরো ছায়া রাস্তায় পড়াতে এমন লাগছে। অনিল এগিয়ে চললো। অবশেষে সে যখন কোয়ার্টারের সামনে এলো তৎক্ষণাৎ তার চোখ গিয়ে পড়লো বটগাছটির দিকে। পুরো অন্ধকারে ঘেরা বেদিটা আজ যেন খুব শান্ত। অনিল কোয়ার্টারের চাবি খুলে সাইকেলটা ঘরে ঢুকিয়ে দরজায় ছিটকানি তুলে দিলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত ৮টা বেজে গিয়েছে ইতিমধ্যে। অনিল বন্ধ জানালাটা খুলে খাটের ওপর উঠে লম্বা হয়ে একটু জিড়িয়ে নিলো। এভাবে কখন যে তার চোখ লেগে গেলো তার নিজের-ও অজানা। কাল রাতে ঘুম হয়নি তাই বোধহয় আজ নিদ্রা তাকে এতো তাড়াতাড়ি গ্রাস করে ফেলেছে। কিন্তু তা আর বেশিক্ষণ গ্রাস করতে পারলো না।এক থালা পড়ার মতো আওয়াজে অনিলের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঝটপটিয়ে উঠে বসলো সে। ঘড়ির দিকে চোখ যেতেই দেখে রাত তখন ১১টা। হয়তো বড়ো রাস্তার ওপারের দোকানের রাধুনিটা খাওয়ার নিয়ে এসে সারাশব্দ না পেয়ে ফিরে গেছে। তাদের খাওয়া দাওয়া সব বড়ো রাস্তার ওপারের হোটেলটা থেকেই একজন রাধুনি এসে দিয়ে যায়। অনিলরা মাসে এর টাকা দিয়ে দেয় সবাই মিলে। এরপর অনিল মেঝেতে চোখ দিয়ে দেখে তার মুড়ি খাওয়ার থালাটা মাটিতে পড়ে রয়েছে। অনিল বেশ ধারনা করতে পারলো এটা কার কাজ। ইঁদুর! কোয়ার্টারে এই এক উপদ্রব। অনিল খাট থেকে নেমে প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে আবার সেই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে টান দিতে থাকলো। বটগাছটির মাটির তৈরি বেদি থেকে কোনো আজ রহস্যের উদয় হলো না। এভাবে কিছুক্ষণ থেকে অনিল সিগারেটটা জানালা দিয়ে ফেলে সবে মাত্র জানালাটা লাগিয়েছে এমন সময় তার মনে এক অস্থিরতার উদয় হলো। তার মনে হতে লাগলো স্পষ্ট কারো পায়ের শব্দ। না দুই পা নয় তিন চার পা। অনিল পুলিশের লোক তাই এসব ইঙ্গিত সে ভালোই বোঝে। অনিল জানালাটা কিঞ্চিত ফাঁক করে যা চাক্ষুষ করলো সেটা অভাবনীয়। সে দেখলো - সেই বটগাছটির নিকট এক মানুষ দাড়িয়ে। তার মুখোমুখি আরেক জন। হাতে পিস্তল। দুজনের গায়েই মোটা কালো জ্যাকেট। মুখে রুমাল বা কিছুর এক বাঁধা প্রলেপ। একজনের দৃষ্টি বটগাছটির বেদির দিকে অন্যএকজনের চোখ যেন চারপাশে বিবর্তন করছে। অনিল পুরো ঘটনাটা জানালার ফাঁক দিয়েই বুঝবার চেষ্টা করলো। সে খুব জানে এখানে নিজের বিরত্ব দেখাতে যাওয়া মানে মৃত্যু অনিবার্য। তার কাছে পিস্তল-ও নেই বর্তমান। কনস্টেবল হওয়ার দরুন সব থানায় জমা দিয়েই আসতে হয়। যে লোকটি বেদির দিকে তাকিয়ে ছিলো সে এখন বেদির চারদিক যেন নখের আঁচড়ে মাটি খামচাতে থাকলো। কিছু যেন একটা খোঁজবার চেষ্টা। তাদের মুখ যেন ভীষন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। এরকম করে প্রায় ১০ মিনিট কেটে গেলো। এরপর অনিল যেটা দেখলো সেটা তার জন্য খুব একটা মঙ্গলজনক নয়। তারা দুজন যেন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। এবার তারা অনিলের সেই জানালার দিকে এগিয়ে আসতে থাকলো। একজন পিছন থেকে এক ধারালো ছুরি বের করে আনলো আর একজনের হাতে সেই পিস্তল পুরো জানালার ওপর তাক করা। অনিল তৎক্ষণাৎ জানালা ছেড়ে নিচে বসে পড়লো। হয়তো এবার লড়াই-এর সময় আসন্ন। কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর সে দেখলো কোনোরকম প্রয়াস ওদের দিক থেকে এলো না। অনিল এবার আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগাতে থাকলো। দরজা খুলতে যাবে এমন সময় দরজায় ঠোকা পড়লো। তার সারা শরীর আতঙ্কের চাদরে যেনো মোড়া পড়লো। সে লোকদেখানো সাহসিকতার সাথে জিজ্ঞেস করলো ' কে? কি চায় এতো রাতে?'। প্রশ্নের উত্তর এলো গম্ভীর কন্ঠে 'আমি! দরজা খোলো'। গলাটা অনিলের বেশ চেনা। সে দরজার ছিটকানি নামিয়ে দেখলো তার সামনে স্বয়ং দাড়িয়ে থানার বড়োবাবু। অনিলের এবার যেন চলে যাওয়া সাহসটুকু মনে ফিরে এলো। সে জিজ্ঞেস করলো 'কি ব্যপার স্যার? এতো রাতে এখানে, কোনো সমস্যা হয়েছে?'। বড়োবাবু বললো 'দুটো চোরা চালানকারীর পিছু নিয়েছিলাম। অনেকদিন ধরে ইনফরমেশন ছিলো আমার কাছে। আজ বাগে পেয়েছিলাম, কিন্তু ভাগ্য ক্রমে হাতের লাগান ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাদেরই পিছু নিতে নিতে খুব পিপাসা পেয়েছিল ভাবলাম তোমার কোয়ার্টার থেকে একটু জল পান করে যাই '। অনিলের এবার কিছুটা স্পষ্ট হলো সে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো' তা কেমন দেখতে কিছু বুঝতে পেরেছেন? 'বড়োবাবু বললো' বিলক্ষণ! তা বই কি। ওইতো গায়ে কালো জ্যাকেট আর মুখ গুলো বাঁধা। হাতে একজনের আগ্নেয়াস্ত্র-ও দেখেছি'। অনিলের এবার সবটা স্পষ্ট হলো। এতক্ষণ যে ঘটনার সাক্ষী হয়ে অনিল ছিলো তা আর কেউ নয় বড়োবাবু যাদের কথা বলছেন তারাই। কিন্তু ওরা বটগাছটির বেদিতে কি খুঁজছিলো? অনিলের মনে প্রশ্ন দানা বাঁধলো।তার মনে হলো সবটা বড়োবাবুকে বলা দরকার। বড়োবাবু উঠতে যাবে এমন সময় অনিল বললো 'স্যার আমি ওদের দেখেছি'। বড়োবাবু বললো 'তাই নাকি? কোথায় দেখেছো বলো? আমি এখনি ওদের অ্যারেস্ট করবো'। অনিল বললো ' আসুন আমার সাথে'। এই বলে সে বড়োবাবুকে নিয়ে বটগাছটির সামনে গেলো। বললো 'স্যার আপনার উত্তর আপনি এখানেই পেতে পারেন'। বড়োবাবু বেশ অবাক দৃষ্টিতে অনিলের দিকে ফিরে আবার বটগাছের বেদিটার দিকে চোখ দিলো। দেখতে পেলো মাটির বেদিটা যেন নখের আঁচড়ে কেউ ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে। বড়োবাবু বসে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলো। অনিল যেনো কিছু একটা খুঁজে চলেছিল। ইতিমধ্যেই অনিলের মনে কাল রাতের রহস্যময় স্মৃতি জেগে উঠেছে। হঠাৎ অনিলের জুতো পড়া পা আবার পড়লো কাল রাতের সেই রহস্যময় পাথরের ওপর। না এবার আর সে কোনো ভুল করেনি। পা সরায়নি। স্যারের দিকে তাকিয়ে বললো ' স্যার এখানে কিছু একটা আছে, আপনি আসুন'। এবার আস্তে আস্তে সে পা সরিয়ে সেই পায়ের ছাপ বিশিষ্ট মাটির ওপর হাত নিয়ে গেলো। তার হাতে লেগে গেলো সেই রহস্যময় উত্তর। এক আংটি। হিরের আংটি! অনিলের চোখ বিস্ময়ে ভরে গেলো। বড়োবাবু হতবাক হয়ে বললেন 'এ তো! এ তো! রমেন দাসের ফটোতে দেখানো সেই চুরি যাওয়া হিরের আংটি'।এটা এখানে কি করে এলো? '।অনিল বললো' 'আপনাকে সকালে আমি যে ঘটনা বলেছিলাম এবার বুঝলেন তো ওটা কোনো পাথর ছিলো না।এটা একটা হিরের আংটি'। বড়োবাবু শেষে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো 'যাক তাহলে আংটিটা পাওয়া গেলো ', এবার যার আংটি তাকে ফেরত দেওয়াই ভালো।' অনিল বললো 'সে না হয় হলো, কিন্তু রহস্যের উদঘাটন হলো কি?'। সেই চোরা চালানকারী, আমাকে গুলি, আজ এখানে ওদের পদার্পণ সবকিছুর কারন একটাই স্যার। এই হিরের আংটি'। বড়োবাবু বললেন 'কি রকম?' অনিল বললো' চলুন ভিতরে বলছি সব '। ঘরে ঢুকে অনিল বললো 'দেখুন স্যার আমার মনে হয় এরাই রমেন বাবুর বাড়ি থেকে আংটিটা চুরি করেছে। আর এরা রমেন বাবুকে হয়তো ভালো করেই চেনে। হতে পারে ওনার বাড়িতে যারা শাল গাছ কেটেছিলো এরা তাদের মধ্যেই কেউ। আর রমেন বাবুর বাড়ি না থাকার সুযোগ নিয়ে তার ঘরের দরজা ভেঙে ড্রয়ার থেকে আংটিটা চুরি করে। আর যাতে অন্য সতীর্থদের ভাগ দিতে না হয় তাই এই দুজন পরিকল্পনা মাফিক ফেরার পথে এই বটগাছের মাটির বেদিটার মধ্যে আংটিটা লুকিয়ে রাখে পরে সেটা বের করে বেশি দামে কোথাও বিক্রি করবে।আর আমার ধারনা কাল দুপুরে চুরির পর-ই তারা এই কাজটা করে যায় আর সেই সময় আমার দুই সতীর্থ ঘুমাচ্ছিল সারারাত ডিউটি করার পর, আর আমিও থানায় ছিলাম তাই এলাকাটা নিস্তবদ্ধই ছিলো  আর বাইরে হালকা বৃষ্টি-ও পড়েছিলো এই সুযোগে তারা আংটিটা লুকিয়ে যায়। আর রাতে যখন তারা নেওয়ার জন্য আসে তখন আমাকে এর সামনে পেয়ে যায়, ভাবে অন্যকোনো দলের চোরাচালানকারি। আমিও হয়তো আংটির খবর পেয়ে খুঁজতে এসেছি। তাই গুলি চালায়। আর ভাগ্য ভালো গুলি লক্ষভ্রষ্ট হয়। বড়োবাবু এবার যেন সবটা বুঝে উঠেছেন। বললেন 'ও তাই কাল তুমি যে আলো দেখেছিলে সেটা এই আংটির! বৃষ্টি হওয়াতে মাটি ধুয়ে আংটি মাথা উঁচু করে ভাঙা লাইটের আলোতে আংটির হীরে প্রতিফলিত হয়ে তোমার নজরে গিয়ে পড়েছিলো তাইতো? আর তুমি সেই দেখতে এসেই এই ঘটনা'। অনিল বললো 'একদম তাই। আর যখন গুলি চলে তখন আমি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ি আর তখন আংটির ওপর-ই পা বসে যায় আর আমিও সেটাকে রহস্যময় পাথর ভেবে বসি। আর আজ যখন ওরা নিতে আসে তখন আপনার নাগালে পড়ে যায় কিন্তু তাও ওরা কোনোক্রমে আপনার চোখে ধুলো দিয়ে আংটি খোঁজার কাজ সম্পূর্ণ করেও বিফলে যায়। অবশেষে আপনাকে আমার কোয়ার্টারে দেখে পালিয়ে যায়।রহস্যের ইতি এখানেই '। বড়োবাবু এবার উঠে দাঁড়িয়ে অনিলের ঘাড়ে হাত দিয়ে তাকে তার বুদ্ধির প্রশংসা করে প্রস্থান করে। অনিল-ও দরজায় ছিটকানি টেনে বিছানায় যায়। আজ এক স্বস্তির ঘুম তার জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে। পরে না হয় চোরা চালানকারীদের ধরার বিষয় টা থানায় গিয়ে বড়োবাবুর কাছ থেকে জানা যাবে।

নিঝুম রাত
প্রবাল ভদ্র

পরবর্তী পর্ব - - - - - - 

Comments

Passionate writer

রুমাল ( স্বার্থত্যাগী ভালোবাসা সাথে বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি)

পাগল প্রেমিক (জটিল বাস্তবতার বাইরে কল্পনাহিত অপেক্ষা)

না বলা কথা