দুর্লভ স্নেহ (সমাজের কলঙ্ক উপেক্ষা করেই সাহসিকতার স্নেহ)


হঠাৎ যেন মাথার ওপরের পাখাটা বন্ধ হতেই ঘুম টা ভেঙে গেল। তখন দুপুর তিনটি পনেরো, বাইরে কড়া রোদ। গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপদাহে বাইরে টেকা দায় বললেই চলে। খাওয়া দাওয়া সেরে সুমন সবে মাত্র একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলো আর তাতেও জল ঢেলে দিল ক্যারেন্ট টা, অফিস কোয়ার্টারের লাইন টাও মাঝে মধ্যে খুব জালাতন করে, একে বাইরে টেকা দায় অন্যদিকে এই ঘরের গুমরো গরম, সত্যি বড়োই অসস্থিকর ।এই পরিবেশের মধ্যেই তাকে দিব্যি মানিয়ে নিতে হয় কেননা এখনকার দিনে এরকম আর একটা চাকরি জোগাড় করা খুবই দুর্লভ ব্যপার। যাইহোক, সুমন খাটের পাশের জানালাটা খুলে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে এমন সময় তার চোখে পড়লো পাশের খোলা জায়গাটায় একটি ছোট্ট বালক হাতে ব্যাট আর বল নিয়ে দিব্যি একা একা নাচিয়ে চলেছে। তার যেন এই কড়া রোদ্দুরেও বেশ আনন্দ মাথাচারা দিয়ে উঠছে। সে তার একার মনে দিব্যি খেলে চলেছে। সুমনের বেশ দেখে ভালোলাগলো কিন্তু তার মাথায় একটা চিন্তা বারবার আসছিলো এই কড়া রোদে তার পিতা মাতাই বা কি করে বাচ্চাটিকে একা একা ছেড়ে দিয়েছে। হঠাৎ বাচ্চাটির সামনে এক পাগল রূপি ভদ্রলোক উপস্থিত হয়। সুমনের বেশ আতঙ্ক লাগে ব্যপার টা। দিনকাল তেমন ভালো নয় আর একটা বাচ্চা একা একা এরকম একটা লোকের সামনে তাই সুমন দরজাটা খুলে সবে মাত্র বাইরে পা  দিয়েছে এমন সময় তার চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় বাচ্চা আর লোকটা দুজনেই। সুমন বেশ ব্যস্ত হয়ে ওঠে চারদিকটা ভালো করে খোঁজে সে, কিন্তু কারো দেখা পায় না। সুমনের মনে না না ধারনা জন্ম নিতে থাকে যতই হোক ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোক বলে কথা। ওই দূরে এক কাঠুরিকে আস্তে দেখে সুমন তাকে জিজ্ঞেস করে সে একটা ছোট্ট বাচ্চাকে আশেপাশে পর্যবেক্ষণ করেছে কি না। কিন্তু কাঠুরির উত্তর টা না ই আসে, অতঃপর সুমন তার ডিপার্টমেন্টের লোকদের ব্যপারটা জানিয়ে খোঁজা খুঁজি শুরু করে, দেখতে দেখতে বিকেল ঘনিয়ে আসে কিন্তু সুমনের বেশ অবাক লাগে এই ভেবে যে বাচ্চাটার পিতা মাতা কোনো ভাবে তার খোঁজ কেনো করছেনা। অনেকটা খোঁজা খুঁজির পরও বাচ্চাটার খোঁজ পাওয়া যায় না অনেককে জিজ্ঞেস করাতেও কোনো আশাগত উত্তর আসে না। অবশেষে হাল ছেড়ে সুমন কোয়ার্টারের দিকে ফিরে যায়। ইতিমধ্যে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসে, কোয়ার্টারের চারপাশটা সন্ধ্যাবেলায় নিঝুম ই থাকে তেমন লোকের যাতায়াত খুব বেশি নয়। পিছনের দিকটায় কিছু বাড়ি ঘর থাকলেও তাদের প্রবেশদ্বার টা অন্যদিকে পড়ে যাচ্ছে। সুমন হাতে গল্পের বই টা খুলে নিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে থাকলেও তার মন ওই মিষ্টি বাচ্চাটার কাছেই পড়ে আছে। তার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না বাচ্চাটা কোথায় যেতে পারে তার কি সত্যি কোনো বিপদ হলো আর ওই লোকটাই বা কে।
   এই করে বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। একদিন তাদের অফিসের এক কর্মচারীর মৃত্যুর খবর ভেসে আসে সুমনের কানে। এতো বড়ো অফিসে সবাইকে যে চেনা সম্ভব তা নয় কিন্তু কর্মী হিসাবে একজনের মৃত্যুতে তার পরিবারের পাশে থাকাটা বেশ কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে সুমনের। তাই সে চটজলদি সেই মানুষটির বাড়িতে উপস্থিত হয়। সেখানে গিয়ে সুমনের চক্ষু ছানাবড়া, সেদিনের সেই বাচ্চা ছেলেটি শবদেহটির পাশে বসে বেশ নিজের মনে কিছু যেন একটা বোঝার চেষ্টা করছে আর মৃতদেহের বেশে সেই অগোছালো চেহারার মানুষটি। যাদের সেদিন খোঁজার জন্য সুমন পাগল হয়ে পড়েছিল। সে সেদিন এক বাবা আর সন্তানের বন্ধন টা বুঝে উঠতেই পারেনি। সব কথা ভেবে সে এক অশ্রুআহিত চোখে মৃত্যুর কারন সুধায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য এক কর্মীকে। লোকটি নাকি বহুদিন ধরেই ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিল তাই অনেকদিন আগেই অফিসের সাথে সম্পর্ক চুকিয়েছে তাই সুমনের কোনোদিনই লোকটিকে চোখেই পড়ে নি।
        সুমন তখন সেই ছোট্ট বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে আসে। বহুদিন আগেই বাচ্চাটির মা কোনো কারনে পৃথিবী ছেড়েছে, তার সম্বল ছিল তার অসুস্থ বাবা ই। আর এখন একা বাচ্চাটি পরিজনবিহীন।
      দেখতে দেখতে রাত ঘনিয়ে এসেছে। ছোট্ট বাচ্চাটিও দিব্যি সুমনের কাঠে বেশ সরলতার ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। সুমন তার অফিসের ব্যাগ থেকে এক ডায়েরির পেজ ছিড়ে তাতে কিছু একটা লেখার উদ্দেশ্যে।
   
   অবশেষে রাত কেটে সকালের আলো ফুটেছে। সুমন চটজলদি বাচ্চাটিকে তৈরী করে নিজের বড়ো ব্যাগটি গুছিয়ে কোথাও এক যাওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরী। ইতিমধ্যেই সে এক সহকারীকে দিয়ে কাল রাতের লেখা চিঠিটা অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছে। বেড়ানোর সময় মেন দরজায় বড়ো তালাটা দিতে যাবে এমন সময় তার মাথায় অনেক চিন্তা ভেসে ওঠে। এই সমাজ কি বাচ্চাটা কে মেনে নেবে তার সম্পর্কের সাথে। কি পরিচয় পাবে এই ছোট্ট বাচ্চাটি তার কাছ থেকে। এসবের মধ্যেও সে ভাবনাগুলোকে তোয়াক্কা না করেই তালাটা লাগিয়ে চাবি টা সহকারীকে জমা দিয়ে বাচ্চাটির হাত ধরে স্টেশনের পথে। সুমনের মনে তখন বিরাজমান বাচ্চাটিকে অনেক বড়ো মানের মানুষ করে তোলার, অন্য কোথাও অন্য কোনো শহরে। যাতে তার প্রতিষ্ঠিত চেহারা টা পরবর্তী কালে সুমনের গায়ে লাগা কলঙ্ক দূর করতে পারবে। সেই কলঙ্ক, যে কলঙ্ক কিনা আর কিছু সময় পরই হয়তো সমাজ এঁটে দেবে সুমনের গায়ে।

        লেখা :প্রবাল

Comments

Passionate writer

রুমাল ( স্বার্থত্যাগী ভালোবাসা সাথে বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি)

পাগল প্রেমিক (জটিল বাস্তবতার বাইরে কল্পনাহিত অপেক্ষা)

না বলা কথা