মধ্যবিত্ত জীবন




ঘরির কাটা নয় ছুঁই ছুঁই। সুবীর বাবু তখনো বারান্দায় তার প্রিয় চেয়ার টি তে বসে পেপারের পাতাগুলি উলটে চলেছেন। ইতিমধ্যে তেনার পেপারটি এক দুই বার পড়া হয়ে গেছে, পাশে খালি চায়ের কাপটার দিকে ওনার ঘন ঘন তাকানোটাই পরিষ্কার করে দিচ্ছে তার মধ্যবিত্ত জীবনের এ যেন এক বড়ো প্রেম। ঘরির কাটা নয়ের ঘর ছুঁতেই হঠাৎ মুখার্জি গিন্নীর এক প্রচন্ড হাঁক ভেসে আসে সুবীর বাবুর কানে, সুবীর বাবু তৎক্ষণাৎ ওখান থেকে উঠে ঘরের ভিতরে, কেননা মুখার্জি গিন্নীর হাঁককে অগ্রাহ্য করার সাধ্য সুবীর মুখার্জি নামক ভদ্রলোকের ছিল না। সুবীর বাবু ঘরে এসে তেল আর গামছা টা নিয়ে সোজা স্নান ঘরের দিকে পা বাড়ালেন, তিনি অফিসে কাজ করে পয়সার যোগান দিলেও বাড়িতে যে ওনার স্ত্রী ই বাড়ির মালিক সেটা না বল্লেও চলে। শান্ত স্বভাবের ভদ্রলোক হয়তো বিয়েতে যৌতুক হিসাবে তার স্ত্রীর মেজাজ চিৎকার এসব কেই সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। অবশেষে স্নান সেরে কাঁপতে কাঁপতে মানুষটি বেড়িয়ে এলেন, ইতিমধ্যে মুখার্জি গিন্নী টেবিলে ওনার মধ্যবিত্ত খাওয়ার মেনু সাজিয়ে রেখেছেন। সুবীর বাবু ফিটফাট হয়ে অফিসের পোষাক গায়ে চাপিয়ে খাওয়ার টেবিলে বসে পড়লেন, খাওয়া দাওয়া সেরে দরজার সামনে ঝুলিয়ে রাখা ঠাকুরের পায়ে দুবার প্রনাম ঠুকে বেড়িয়ে পড়লেন অফিসের উদ্দেশ্যে। ওনার বাড়ি থেকে বাসস্ট্যান্ড যাওয়ার রাস্তাটা খুব বেশি দূর নয় তাই বরাবর হেঁটেই বাসস্ট্যান্ড অবদি যান, রাস্তায় দু একটা রিক্সা চললেও তার যাত্রাপথের কখনো ব্যতিক্রম হয় না।হেঁটে বাসস্ট্যান্ড পৌঁছানো মাত্রই সেই চেনা বাসটি সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়। হাজারো ঠেলাঠেলি সত্বেও কোনোরকম বাসের মধ্যে প্রবেশ করে ডান হাতটি বাসের কার্নিশ ছুঁয়ে এখন অফিসের উদ্দেশ্যে, অফিস যাওয়ার রাস্তাটা বেশ লম্বা। শহরের হাজার ব্যস্ততা, হাজার কোলাহলের মধ্যে দিয়ে কানফাঁটা হর্ন বাজিয়ে এগিয়ে চলেছে বাসটি। সেই রাস্তাতেই সুবীর বাবুর ছোটবেলার স্মৃতি জড়ানো স্কুলটির পাশে ব্রেক কষলো বাসটি, বাসের ভিতর থেকে একদল ছোটো শিশু নেমে আসে তাদের দেখে সুবীর বাবুর চশমা আবৃত চোখটায় স্মৃতি জড়ানো এক অনুভূতি ভেসে ওঠে। অবশেষে বাসটি সেই স্থান ছেড়ে এগিয়ে যায়, চলতে চলতে কিছুদূর এগাতেই সুবীর বাবুর চোখ যায় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ওনার প্রিয় ছোটবেলার আঁকার স্কুলের দিকে, যে স্কুলে ওনার ছোটবেলার অনেকটা সময় কেটেছে। সে সব ওনার কাছে আজ অতীত আর বর্তমান হলো ঘষে মেজে এগিয়ে চলা মধ্যবিত্ত জীবন। দেখতে দেখতে অফিসের একদম বাইরের বড়ো গেটের সামনে বাসটি ব্রেক কষলো। সুবীর বাবু বাস থেকে নেমে অফিসের মধ্যে প্রবেশ করে তার চেনা স্থানটিতে বসে ফাইল পত্র গুলি ঘাটতে যাবে তখনই অফিসের এক কলিং এর মুখ থেকে শুনতে পায় আজ নাকি অফিসে এক সম্প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছে, কথাটা শুনে সুবীর বাবুর চোখে এক আনন্দের ছটা খেলে গেল। চিরকালই বাঙালির ফুটবলের প্রতি একটা আলাদা অনুভূতি আছে সেখান থেকেই কি এতটা আনন্দ সুবীর বাবুর চোখে মুখে নাকি কাজের ব্যস্ততাকে ফাঁকি দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য প্রনদীত আনন্দ?।
               দেখতে দেখতে সবার আনন্দ হাসির মাঝে ফুটবল ম্যাচ শুরু হয়, প্রায় ঘন্টা খানিক চলে ম্যাচটি, এর বেশি ম্যাচ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি বা খেলার তাগিদ ছিল না কারো মধ্যেই। সবার অনুমতি নিয়ে ম্যাচটির ইতি ঘোষণা করেন ম্যাচের দায়-প্রাপ্ত রেফারি তথা অফিসেরি এক কর্মচারী। তখনো সুবীর বাবু মাঠের মধ্যে বল পায়ে নাড়িয়ে চলেছেন, পিছন থেকে মিত্তির বাবু সুবীর বাবুর কাঁধে হাত দিয়ে ওনার খেলার প্রশংসা করে জানান তিনি নাকি সত্যি খুব ভালো ফুটবল খেলেন। মিত্তির বাবুর কথা শুনে তিনি একটু আবেগপ্রবন হয়ে পড়লেন।সুবীর বাবুর মনে পড়ে গেল তার প্রিয় ফুটবল মাঠের কথা যেই মাঠে তিনি খেলাধূলা করে অনেক সুন্দর সুন্দর খেতাব জিতেছিলেন, সেদিন ও ওনার পিঠে হাত চাপড়ে ওনার শিক্ষক বলতেন," এভাবেই এগিয়ে যাও বড়ো হও", কিন্তু সত্যি আজ তিনি অনেকটা বড়ো হয়েছেন বেশ বয়স ও হয়েছে ওনার কিন্তু সবটুকুই এই মধ্যবিত্ত জীবনের মাঝেই তার বাইরে নয়।
         দিনটা আস্তে আস্তে কমতে থাকে, ঘড়ির কাটা চারটে ত্রিশ, আজ একটু এভাবেই অফিসের দিনগুলি কেটে যায় এবার সুবীর বাবু বাসের একেবারে জানালার সিটে বসে বাড়ির পথে, কিছু একটা ভেবে ভেবে তিনি এগিয়ে চলেছেন। অবশেষে সূর্য টা অস্ত যাওয়ার পথে আর সুবীর বাবু পৌঁছেলেন নিজের বাড়িতে। কলিং বেলের পরিচিত আওয়াজ শুনে ওনার স্ত্রী দরজাটা খুললেন, সুবীর বাবুও শুকনো মুখে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলেন হয়তো সকাল থেকে বিকেল অবধি কাজের চাপ ও অতিরিক্ত ক্লান্ততাই লোকটির চোখে মুখে ধরা পড়েছে। আর তার ওপর আজ আবার ফুটবল ম্যাচের ক্লান্ততা। এসবের মধ্যে তিনি দু-মুঠো ভাত মুখে দিয়েই সিগারেট টা ধরিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেটের টান দিতে দিতে নিজের অপূর্ণ ইচ্ছে গুলি নিয়ে ভাবতে থাকেন। জানালার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে অপূর্ণ ইচ্ছে গুলি বেরিয়ে আকাশের রূপরেখায় মিশতে থাকে। দেখতে দেখতে সিগারেট টা শেষ হয়ে আসে সুবীর বাবু সিগারেট টা জানালার বাইরে ফেলে জানালাটি বন্ধ করে টেবিলের ওপর থেকে তার এক সময়ের প্রিয় ডায়েরি আর পেনটা নিয়ে কিছু লিখতে যাবে এমন সময় খেয়াল হলো কাল অফিসের অনেকগুলি ফর্ম ফিলাপ করার আছে, ওগুলো না করতে পারলে কাল আবার বসের গুঁতোনি। তিনি তৎক্ষণাৎ ডায়েরি আর পেনটা তুলে রেখে ফর্ম গুলি বের করে আবার মধ্যবিত্ত জীবন সংগ্রামে চেনা কাজের কবলে মত্ত হলেন। পরিচিত জীবন সংগ্রামে অফিস ও বাড়ির গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেন।

                          লেখা : প্রবাল

Comments

Passionate writer

রুমাল ( স্বার্থত্যাগী ভালোবাসা সাথে বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি)

পাগল প্রেমিক (জটিল বাস্তবতার বাইরে কল্পনাহিত অপেক্ষা)

না বলা কথা