না বলা কথা পর্ব ২ Na bola kotha part 2
না বলা কথা পর্ব ২
বেলা গড়িয়ে তখন সকাল এগারো টা, স্টেশনের একবারে বাইরের গেটের সামনে গাড়িটি ব্রেক কোষলো। দরজা টা খুলে রিমি নামতে যাবে এমন সময় তার পরনে থাকা ওরনাটার স্বল্প টানে সে মুখ ঘুরিয়ে গাড়ির দরজায় বেধে যাওয়া ওরনাটিকে ছাড়িয়ে, সামনের সিটে রাখা তার প্রিয় স্কুলব্যাগ টি নিয়ে স্টেশনের ভিতরের দিকে অগ্রসর হয়। পিছনে তার বাবা মা লাগেজের বেগটি ধরে তার পিছু স্টেশনের মধ্যে প্রবেশ করেন। দেখতে দেখতে তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম টায় ভিড়ের ব্যস্ততার মাঝে এসে দাঁড়ায় তাদের অন্য শহরে পাড়ি দেওয়ার সাথী। রিমি আর দেরি না করে তার বাবা মায়ের সাথে ট্রেনের মধ্যে প্রবেশ করে, জানালার ধারে রাখা রিজার্ভ সিট দখল করে অজানা শহরে পৌঁছানোর প্রতিক্ষনে। অবশেষে ট্রেনের চেনা হর্ন পড়ার সাথে সাথে রিমির মনে বেজে ওঠে এই শহরের বিদায়ী ঘন্টা। আসতে আসতে রেললাইনের দুটি পাতের মধ্যে দিয়ে স্টেশন ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে থাকে ট্রেনটি, আর তখনো তাদের স্টেশনে পৌঁছে দেওয়া ভাড়া গাড়িটির চালকের আসন টা টিপ টিপ চোখের জলে ভিজতে থাকে। চালকের আসনে বসে থাকা মানুষটির চোখের জল কে পাত্তা না দিয়েই নিজের অজান্তে রিমি আজ অন্য শহরের পথের সৌন্দর্যতা কে আমল দেওয়ায় ব্যস্ত। দেখতে দেখতে একটি গোটা দিন কেটে যায়, অবশেষে রিমি পৌঁছায় নতুন এক শহরে। আর তার পুরোনো শহরটিতে অশ্রুচ্ছন্ন অপেক্ষায় বসে থাকে, তাকে নিয়ে প্রেমের রচনা লিখে চলা তার অজানা প্রেমিক সুমন। যে কিনা নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে শত কষ্ট চেপে রেখে নিজে গাড়ির চালকের আসনে বসে স্টেশন অবদি পথটা এগিয়ে দেয়। এভাবে আস্তে আস্তে কারো সুখ আর কারো দুঃখে দিনগুলো কাটতে থাকে। রিমি অন্য শহরে নিজেকে দিব্যি মানিয়ে নিয়ে নিজের পড়াশোনা, নিজের হাসি খুশি জীবন কে মূল্য দিতে ব্যস্ত থাকে, আর অন্যদিকে সুমনের কষ্টসহিষ্ণ জীবন টা কালো ধোঁয়া মাখা গ্যারেজর গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে আর সাথে পড়াশোনা করে নিজের কিছু স্বপ্নপূরনের তাগিদ বাড়তে থাকে। যে গ্যারেজে কষ্টের সহিত কাজ করে সুমন নিজের পড়াশোনার খরচ এগাতে থাকে, আজ সেই গ্যারেজের রাস্তা দিয়ে রিমির কলেজ যাওয়ার স্মৃতি গুলি সে প্রতিনিয়ত অনুভব করতে থাকে।
হঠাৎ একদিন রিমি তার প্রিয় স্কুলব্যাগ টা ঘাটতে ঘাটতে এক ছোট্ট চিঠি খুঁজে পায়, কাগজে মোরা সেই চিরকূট টা ব্যাগের কোনার দিকে এক চেনে খুঁজে পায় সে। চিঠিটা দেখে বেশ আশ্চর্য হয়ে পড়ে রিমি, কেই বা তাকে এই চিঠি প্রদান করতে পারে?, এটা নিয়ে রিমি যখন ভাবনায় ব্যস্ত তখন তার পুরোনো শহরের সেই অজানা প্রেমিক সুমন রিমিকে স্টেশনে পৌঁছানোর দিনে লুকিয়ে যে চিঠি রিমির ব্যাগের কোনো এক চেনে গুঁজে দিয়েছিল তার উত্তরের জন্য অপেক্ষারত। রিমিকে দেওয়া সুমনের চিঠি ছিল..................
প্রিয় বন্ধু,
প্রথমেই মাপ চেয়ে নিচ্ছি তোমার কাছে চোরের মতো এই চিঠি তোমাকে প্রদান করার জন্য, এই পৃথিবীতে তোমার হাসি কান্না এসব সঙ্গ দেওয়ার সাথী অনেকে আছে সেই অনেকের মধ্যে আমাকে যদি একটু ছিটেফোঁটা সুযোগ দাও তাহলে তোমাকে নিয়ে লিখে চলা আমার অজানা গল্পকাহিনী কিছুটা সার্থকতা লাভ করবে। তুমি যখন ভাঙা গ্যারেজ টার পাশ দিয়ে ঠোঁটের কোনে স্বল্প হাসির বিনিময়ে তোমার প্রিয় কলেজ টায় যেতে, সেই মুহূর্ত গুলো আজ বেরঙিন আমাদের গল্পকাহিনীর পেজে। তোমাকে নিয়ে লিখে চলা আমার রঙিন রচনাবলী আজ মাঝপথে বেরঙিন হয়ে যাওয়ার উপক্রম। যদি কখনো আবার এই পুরোনো স্মৃতি জড়ানো শহরে ফিরে এসো তাহলে তোমার বন্ধুত্বের হাতটি ধরার এক সুযোগ করে দিও। নিজেকে চালকের আসনে বসিয়ে তোমাকে অন্য কোনো শহরের পথে কিছুটা এগিয়ে দিয়েও আজ আমি চাতকের বেশে তোমার পুনরায় এ শহরে ফিরে আসার অপেক্ষারত।
ইতি
তোমার অজানা বন্ধু
আস্তে আস্তে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসে, রিমি চিঠিটা কে হাতে নিয়ে খোলা জানালার সামনে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবনায় মত্ত হয়। ইতিমধ্যে রিমির কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে যায়, তারা যে গাড়ি করে স্টেশন অবদি এসেছিল সেই গাড়িটির চালক আর কেউ নয় তার হাতে থাকা চিঠির মালিক। রিমি এই ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে যে ছেলেটা প্রতিক্ষনে তাকে অনুসরণ করে গেল নিস্তব্ধ ভঙ্গিতে, তাকে চেনা তো দূর কখনো ভালো করে প্রত্যক্ষ ও করেনি সে।
ঘন কুয়াশার মাঝে শীতের দাপট টা যেন বেড়ে গেল, রিমি জানালাটা বন্ধ করে চিঠি টার দিকে কোনো এক ভাবনা চোখে তাকিয়ে বইয়ের মাঝে লুকিয়ে রাখলো। চিঠিটি যত্ন করে তুলে রাখাটা বোধহয় অন্য কিছুর ইঙ্গিত স্পষ্ট করলো।।
লেখা - প্রবাল ভদ্র

Comments
Post a Comment